ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ‘নিহত’ আল আমিন বেঁচে আছেন   দক্ষিণ সুরমা থানায় বাবার সঙ্গে আল আমিন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট ঢাকার আশুলিয়ায় স্বামী আল আমিন নিহত হয়েছেন দাবি করে হত্যা মামলা করেছিলেন স্ত্রী কুলসুম বেগম। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনকে আসামি করা হয়। কিন্তু ‘নিহত’ সেই আল আমিন আদৌ মারা যাননি। তিনি বেঁচে আছেন এবং সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় তার খোঁজ মিলেছে। র‌্যাব তার সন্ধান পাওয়ার পর তিনি দক্ষিণ সুরমা থানায় গিয়ে হাজির হন। এরপর মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আশুলিয়া থানায়।

সোমবার (১১ নভেম্বর) রাত ৯টার দিকে দক্ষিণ সুরমা থানায় বসে নিজেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান আল আমিন। আল আমিন তার পিতাসহ দুই ভাইকে নিয়ে থানায় হাজির হন একথা জানিয়ে দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আবুল হোসেন বলেন, ‘আল আমিনের পরিবার সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পিরোজপুর এলাকায় গত ৪০ বছর ধরে বসবাস করছে। তাদের মূল বাড়ি লালমনিরহাট জেলা সদরে। মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) সকালে আশুলিয়া থানায় হওয়া হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাকিব এসে তাকে নিয়ে গিয়েছেন।’   

সোমবার (১১ নভেম্বর) রাতে দক্ষিণ সুরমা থানায় বসে করা রেকর্ডিং করা ভিডিওতে আল আমিন বলেন, ‘ভাই আমি মরি নাই, কেউ যদি আমার অজান্তে কাগজে-কলমে মাইরা ফালায়, তাহলে আমার কী বা করার আছে..? আমারে যে মরা দেখাইয়া মামলা করছে আমার বৌ, তা আমি জানতাম না, যখন শুনলাম তখন ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। নিজের স্ত্রী যদি স্বামীকে মৃত বানিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে, তাহলে সেই স্বামী সবচেয়ে দুর্ভাগা।’ 

আল আমিন বলেন, ‘বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে মোবাইল ফোনে কথার সূত্র ধরে ভালোবেসে বিয়ে করি কুলসুমকে। ঘরে একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। কয়েক মাস ধরে পারিবারিক কলহ বেড়ে যাওয়ায় সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। দেশে গণ্ডগোলের পুরোটা সময় আমি ও আমার স্ত্রী মৌলভীবাজারের জুড়িতে অবস্থান করেছি। সেসময় আশুলিয়ায় একবারের জন্যও যাইনি। অথচ আমাকে মৃত দেখিয়ে মিথ্যা মামলা করেছে আমার স্ত্রী।’ তিনি বলেন,‘আমি মরিনি। আমি বেঁচে আছি।’ পরে মামলার বাদী কুলসুমের ছবি দেখে নিশ্চিত করেন ছবির মানুষটি তার স্ত্রী।

আল আমিনের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার ভাই বেঁচে আছে। সে তিন দিন আগে আমাকে বলেছে মামলার বিষয়টি। আল আমিন থানায়ও গিয়েছিল, কিন্তু তারা কোনো সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি। তাই ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে। যখন র‌্যাব বিষয়টি জানতে পারে তখনই ভাইকে দক্ষিণ সুরমা থানায় নিয়ে যাই।’

জীবিত ছেলেকে মৃত দেখিয়ে মামলার ঘটনায় হতবাক আল আমিনের বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এমনটা হওয়ায় আমাদের পুরো পরিবার এখন আতঙ্কিত। ছেলের বৌ কুলসুম কেন এমনটি করেছে তা মাথায়ও আসছে না। বিষয়টি নিয়ে কুলসুম কোনো কথাও বলছে না।’

থানা পুলিশের তথ্যমতে, ‘৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আশুলিয়া থানায় যে হত্যাযজ্ঞ হয়, সেখানকার একজনের পরিচয় ছিল অজানা। সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে নিজের স্বামী আল আমিন দাবি করেন কুলসুম নামের এক নারী। ২৪ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলাও করেন ওই নারী। পরে সেটি ৮ নভেম্বর আশুলিয়া থানায় এজাহারভুক্ত হয়। তবে পরবর্তীতে কুলসুমের আচরণে সন্দেহ হওয়ায় অনুসন্ধান নামেন কয়েকজন সাংবাদিক। বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কুলসুমের স্বামী সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকায় অবস্থান করছেন এমন তথ্যের পর র‌্যাবের সহায়তা চাইলে আল আমিনের ভাইয়ের খোঁজ পায় র‌্যাব। তার সঙ্গে কথা বলে র‌্যাব নিশ্চিত হয় মামলায় মৃত দেখানো আল আমিন বেঁচে আছেন।’